বর্ষায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াবে যেসব খাবার
বর্ষাকাল প্রকৃতিকে যেমন সজীব ও প্রাণবন্ত করে তোলে, তেমনি এই মৌসুমে বেড়ে যায় নানা ধরনের সংক্রমণের ঝুঁকিও। আর্দ্র আবহাওয়া এবং জমে থাকা পানি মশার বংশবৃদ্ধি, ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের দ্রুত বিস্তার, দূষিত পানি এবং অস্বাস্থ্যকর খাবারের কারণে এ সময় সর্দি-কাশি, জ্বর, ভাইরাল সংক্রমণ, ডায়রিয়া, পেটের সমস্যা ও ত্বকের বিভিন্ন রোগ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
বর্ষাকালে সুস্থ থাকার অন্যতম চাবিকাঠি হলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি শক্তিশালী রাখা। বর্ষায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) কোনো নির্দিষ্ট খাবারের চেয়ে ভিটামিন, মিনারেল ও প্রোটিনসমৃদ্ধ সুষম ও বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাস অনুসরণের পরামর্শ দেয়। তাই সংক্রমনের ঝুঁকি এড়াতে তাজা, সুষম ও সহজে হজমযোগ্য দামি ওষুধের চেয়ে দেশীয় খাবারের ওপর জোর দেওয়া উচিত।
বর্ষায় ইমিউনিটি বাড়াতে সহায়ক কিছু প্রধান খাবার:
১.ভিটামিন সি :
ভিটামিন সি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কমলা, লেবু, জাম্বুরা ও পেঁপেতে প্রচুর ভিটামিন 'সি' থাকে।ভিটামিন সি শ্বেত রক্তকণিকার কার্যকারিতা উন্নত করতে এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করতে সহায়তা করে এবং সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীরকে লড়াই করতে সহায়তা করে।
২.মৌসুমি শাকসবজি:
বর্ষাকালে বাজারে সহজেই পাওয়া যায় নানা ধরনের তাজা শাকসবজি। এসব সবজিতে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন, মিনারেল এবং খাদ্যআঁশ, যা শরীরের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী রাখতে সহায়তা করে। তাই খাদ্যতালিকায় পালং শাক, লাল শাক, গাজর, লাউ, ঝিঙা, করলা, কুমড়া, ব্রকোলি কিংবা ফুলকপির মতো সবজি নিয়মিত রাখুন।
৩. আদা, রসুন ও হলুদ: এগুলোতে শক্তিশালী অ্যান্টিভাইরাল, অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি উপাদান রয়েছে। এগুলো স্যুপ, সালাদ বা মসলা-চায়ে মিশিয়ে খাওয়া যায়।
৪. দই ও প্রোবায়োটিক খাবার: দই অন্ত্রের (Gut) স্বাস্থ্য ভালো রাখে এবং হজমশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে, যা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
৫. বাদাম ও বীজ: কাঠবাদাম ও সূর্যমুখীর বীজ ভিটামিন 'ই' ও ফ্যাটি এসিডের চমৎকার উৎস, যা বর্ষায় শরীরের কার্যকারিতা ঠিক রাখে।
৬. গরম স্যুপ ও স্টু: সবজির তাজা স্যুপ ও স্টু শরীরকে হাইড্রেট রাখার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পুষ্টির জোগান দেয় এবং গলার ইনফেকশন কমাতে সাহায্য করে।
৭.পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণ করুন
প্রোটিন শরীরের কোষ মেরামত এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার বিভিন্ন উপাদান তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। খাদ্যতালিকায় ডিম, মাছ, মুরগির মাংস, ডাল, ছোলা, মসুর এবং সয়াবিনজাতীয় খাবার রাখুন। নিরামিষভোজীরা বিভিন্ন ধরনের ডাল, বাদাম ও সয়াবিন থেকে পর্যাপ্ত প্রোটিন পেতে পারেন।
৮.পর্যাপ্ত পানি পান করতে ভুলবেন না
বর্ষাকালে তৃষ্ণা কম অনুভূত হলেও শরীরের পানির প্রয়োজন কমে যায় না। পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি পান করলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে এবং বর্জ্য পদার্থ সহজে বের হয়ে যায়। তাই প্রতিদিন নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানি পান করার বিষয়টি নিশ্চিত করুন।
রাস্তার খাবার ও অতিরিক্ত ভাজাপোড়া থেকে দূরে থাকুন
বর্ষাকালে খাবার সহজেই দূষিত হয়ে যেতে পারে। তাই খোলা পরিবেশে বিক্রি হওয়া কাটা ফল, ফুচকা, চটপটি কিংবা অপরিষ্কার পরিবেশে প্রস্তুত খাবার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলুন। অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাবারও হজমে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে এবং শরীরকে দুর্বল করে দিতে পারে।
ঘরে তৈরি তাজা খাবারই হোক প্রথম পছন্দ
বাইরের খাবারের পরিবর্তে ঘরে তৈরি গরম ও তাজা খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন। রান্নার আগে ফল ও সবজি ভালোভাবে ধুয়ে নিন এবং রান্না করা খাবার দীর্ঘ সময় খোলা অবস্থায় রেখে দেবেন না। এতে খাদ্যবাহিত সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।
বর্ষাকালে সুস্থ থাকতে শুধু একটি খাবারের ওপর নির্ভর না করে সুষম খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত পানি পান, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা(খাওয়ার আগে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া),নিয়মিত ব্যায়াম ও পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা জরুরি। এসব অভ্যাসই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী রাখতে এবং মৌসুমি সংক্রমণের
ঝুঁকি কমাতে সবচেয়ে কার্যকর।
তথ্যসূত্র: মায়ো ক্লিনিক (Mayo Clinic), ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ (National Institutes of Health),বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)
What's Your Reaction?